নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করুন
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে গিয়ে ভুল তথ্যের কারণে বারবার ভোগান্তিতে পড়ার দিন শেষ। ২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন bdris.gov.bd পোর্টাল থেকে খুব সহজেই ঘরে বসে ভেরিফাইড আবেদন করা সম্ভব। তবে সঠিক ঠিকানা নির্বাচন বা নামের বানান ভুল করলে পরে তা সংশোধনের ঝামেলা পোহাতে হয় অনেক।
আপনি যদি কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই নিজেই নির্ভুলভাবে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন সম্পন্ন করতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। ৫টি সহজ ধাপে বোঝানো হয়েছে কীভাবে দ্রুত ও সঠিকভাবে অনলাইনে নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবেন।
জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে?
অনলাইনে আবেদন শুরু করার আগে আপনার কিছু কাগজপত্র হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন। বয়স অনুযায়ী এই কাগজপত্রের চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই আপনার বা যার জন্য আবেদন করছেন, তার বয়স অনুযায়ী নিচের তালিকা থেকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো স্ক্যান করে বা ছবি তুলে রেডি করে রাখুন:
০ থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে
সবচেয়ে সহজে এবং বিনামূল্যে জন্ম নিবন্ধন করা যায় এই বয়সের মধ্যে। এর জন্য যা যা লাগবেঃ
৪৬ দিন থেকে ৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে
এই বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও ওপরের কাগজগুলোই লাগবে। তবে এর সাথে আরও কিছু ডকুমেন্ট যুক্ত হতে পারেঃ
৫ বছরের বেশি বয়স্কদের ক্ষেত্রে
যারা অনেক আগে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু এখনো ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন করেননি, তাদের জন্য একটু বাড়তি কাগজের প্রয়োজন হয়।
সবগুলো ডকুমেন্ট মোবাইল দিয়ে সুন্দর করে ছবি তুলে বা স্ক্যান করে রাখুন। খেয়াল রাখবেন ফাইলের সাইজ যেন ১০০ কিলোবাইট (100 KB) এর নিচে থাকে, নাহলে ওয়েবসাইটের সার্ভার তা গ্রহণ করবে না।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার সহজ উপায়
নিচের ৫টি ধাপ অনুসরণ করলে আপনি কোনো ভুল ছাড়াই আবেদনটি সম্পন্ন করতে পারবেন।
ধাপ ১: শিশুর পরিচিতি ও জন্মস্থানের ঠিকানা দিন
প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইট bdris.gov.bd এ প্রবেশ করুন। সেখানে “জন্ম নিবন্ধন” মেনু থেকে “নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন” অপশনে ক্লিক করলে নতুন একটি পেজ আসবে, যেখানে আপনাকে জন্ম নিবন্ধন আবেদনের জন্য নির্দিষ্ট ঠিকানা নির্বাচন করতে হবে।

এখানে আপনার সুবিধামতো ‘জন্মস্থান’ অথবা ‘স্থায়ী ঠিকানা’ এই দুটি অপশনের মধ্যে যেকোনো একটি সিলেক্ট করে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

এবার অন্য আরেকটি পেজে শিশুর পরিচিতি (নাম, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ ইত্যাদি) ও জন্ম স্থানের ঠিকানা প্রদান করতে হবে।

নাম লেখার বিশেষ নিয়ম: ভবিষ্যতে পাসপোর্ট বা অন্যান্য সরকারি কাজের সুবিধার্থে নাম লেখার ক্ষেত্রে নিচের নিয়মটি অনুসরণ করুনঃ
- নাম এক শব্দের হলে: প্রথম ঘরের বদলে শুধু “শেষ অংশ” এর ঘরে নাম লিখুন।
- নাম দুই শব্দের হলে: প্রথম অংশ প্রথম ঘরে এবং শেষ অংশ শেষ ঘরে লিখুন।
- নাম তিন শব্দের হলে: প্রথম দুই অংশ প্রথম ঘরে এবং শেষ অংশ শেষ ঘরে লিখুন।
বাংলা নামের পাশাপাশি ইংরেজি নামটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্ভুলভাবে লিখুন।
ধাপ ২: পিতা ও মাতার তথ্য যাচাই
এই ধাপে শিশুর পিতা ও মাতার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর (BRN) দিতে হবে। এটি দেওয়ার সাথে সাথেই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের নাম দেখাবে।

যদি পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন অনলাইন করা না থাকে, তবে শিশুর আবেদন করা সম্ভব হবে না। তাই আগে তাদের জন্ম সনদ অনলাইন আছে কি না তা যাচাই করে নিন।
শিশুর জন্ম ২০০০ সালের আগে হলে পিতা-মাতার অনলাইন জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়, সেক্ষেত্রে নাম সরাসরি লিখে দেওয়া যায়।
ধাপ ৩: বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা প্রদান
ঠিকানা নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করে আপনার আবেদনটি কোন অফিসে যাবে। এখানে “জন্মস্থান ঠিকানা”, “স্থায়ী ঠিকানা” ও “বর্তমান ঠিকানা” দেওয়ার আলাদা অপশন পাবেন। তবে জন্মস্থান, স্থায়ী এবং বর্তমান ঠিকানা একই হলে বক্সে টিক চিহ্ন দিলে আলাদা করে আর তথ্য দিতে হবে না।

যেসব তথ্যসমূহ দিতে হবেঃ
- দেশ
- বিভাগ
- উপজেলা
- ইউনিয়ন
- ওয়ার্ড
- ডাকঘর
- গ্রাম
- বাসা ও সড়ক
ধাপ ৪: আবেদনকারীর তথ্য ও মোবাইল নম্বর
এই ধাপে আবেদনকারীর তথ্য দিতে হবে। আবেদনটি কে করছেন? যদি শিশু হয়, তবে তার পিতা, মাতা বা আইনগত অভিভাবকের তথ্য দিতে হবে। আর বড় কেউ নিজের জন্য করলে “নিজ” অপশনটি সিলেক্ট করবেন।

একই পেজে আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো “সংযোজন” বাটনে ক্লিক করে আপলোড করতে হবে। আপলোড করা হয়ে গেলে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করলে অন্য একটি পেজে আপনার আবেদনের সকল তথ্য প্রদর্শিত হবে।

এছাড়াও এই পেজের নিচে ইমেইল এবং মোবাইল নম্বর দেওয়ার অপশন থাকবে, সেখানে একটি সচল মোবাইল নম্বর দিতে হবে। কারণ আবেদনের আপডেট, OTP এবং পরবর্তী সব তথ্য এই নম্বরেই এসএমএস এর মাধ্যমে পাঠানো হবে।

ধাপ ৫: আবেদন ফরম প্রিন্ট ও জমা দেওয়া
সব তথ্য সফলভাবে সাবমিট করার পর একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি জেনারেট হবে। এবার আপনাকে “আবেদনপত্র প্রিন্ট” বাটনে ক্লিক করে ফরমটি প্রিন্ট করতে হবে।

প্রিন্ট করার সময় জরুরি সতর্কতা: প্রিন্ট করার আগে সেটিংস থেকে “Headers and Footers” অপশনটি অবশ্যই অন করে নিন। কারণ হেডারেই আপনার Application ID থাকে, যা ছাড়া অফিস আপনার আবেদনটি খুঁজে পাবে না।
প্রিন্ট করা কপিটির সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (যেমন: ইপিআই কার্ড, পিতা-মাতার আইডি কার্ড বা আগের কোনো প্রমাণপত্র) যুক্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিন।
সাধারণ সমস্যার সমাধান
অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই কিছু সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হন। ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, এগুলোর সমাধান খুবই সহজ।
সমস্যা ১: সার্ভার ডাউন বা ওটিপি (OTP) আসছে না।
সমাধান: BDRIS সার্ভারে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ একসাথে ঢোকার চেষ্টা করে। তাই অনেক সময় সার্ভার স্লো থাকে। চেষ্টা করুন সকালের দিকে বা গভীর রাতে আবেদন করতে, তখন সার্ভার ফ্রি থাকে।
সমস্যা ২: পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন নম্বর নিচ্ছে না।
সমাধান: পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন যদি ডিজিটাল (১৭ ডিজিট এবং অনলাইনে ভেরিফাইড) না হয়, তবে সিস্টেম তা গ্রহণ করবে না। সেক্ষেত্রে আগে আপনার পিতা-মাতার জন্ম সনদ অনলাইন করতে হবে।
সমস্যা ৩: ফাইল আপলোড হচ্ছে না।
সমাধান: আগেই বলেছি, ফাইলের সাইজ ১০০ কেবি (KB) এর বেশি হলে আপলোড হবে না। গুগলে “Image compressor to 100kb” লিখে সার্চ করে যেকোনো টুল দিয়ে আপনার ফাইলের সাইজ কমিয়ে নিন।
FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)
অনলাইনে আবেদন করার পর কত দিন সময় লাগে?
সাধারণত অফিসে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে স্থানীয় অফিসের কাজের চাপের ওপর ভিত্তি করে এটি ১৫ দিন পর্যন্ত সময় নিতে পারে। আপনি অনলাইন থেকে Application ID দিয়ে স্ট্যাটাস চেক করতে পারবেন।
নতুন জন্ম নিবন্ধন করতে ফি কত?
জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন করলে এটি সম্পূর্ণ ফ্রি! ৪৬ দিন থেকে ৫ বছর পর্যন্ত ২৫ টাকা এবং ৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য সরকারি ফি মাত্র ৫০ টাকা।
আমি কি মোবাইল দিয়ে আবেদন করতে পারব?
হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনের ব্রাউজার ব্যবহার করেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে ডকুমেন্ট আপলোডের সুবিধার জন্য ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা বেশি আরামদায়ক।
আমার তো কোনো শিক্ষাগত সনদ নেই, আমি কীভাবে আবেদন করব?
শিক্ষাগত সনদ না থাকলে আপনি আপনার এনআইডি কার্ড (যদি থাকে) অথবা সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের দেওয়া বয়স প্রমাণের প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে আবেদন করতে পারবেন।
শেষ কথা
ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন অনেক নাগরিক সেবাই আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এর মধ্যে জন্ম নিবন্ধন আবেদন অন্যতম। দালালের পেছনে না ঘুরে, একটু সময় নিয়ে নিজে নিজে চেষ্টা করলে এই কাজটি খুব সহজেই করে ফেলা সম্ভব। আমাদের এই আর্টিকেলটি যদি আপনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাকেন, তবে আশা করি অনলাইনে নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার নিয়ম নিয়ে আপনার মনে আর কোনো দ্বিধা নেই।
এরপরও যদি আবেদন করতে গিয়ে কোনো জায়গায় আটকে যান বা কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নির্দ্বিধায় নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত আপনার সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব। আপনার মূল্যবান সময় দিয়ে পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ!
